সিবিএন ডেস্ক;
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের শুকরিয়া বাজার থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ১০০ মিটার গেলেই রাস্তার পাশে চোখে পড়ে একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘর। চারপাশে পলিথিনের বেড়া, ওপরে পুরোনো টিনের ছাউনি। দুই কক্ষের ঘরে আসবাব বলতে একটি খাট ও কয়েকটি চেয়ার। এই ঘরেই থাকতেন মোহাম্মদ নাছির (১৮)।
পরিবারের ছয় ভাইয়ের মধ্যে নাছির ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর আরও চারজন ছোট ভাই রয়েছে। বাবা সেকান্দর আলী বয়সের ভার ও অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। মা জীবন আরা। সংসারের অভাব ঘোচাতে নাছিরই ছিলেন পরিবারের অন্যতম ভরসা। কখনো টমটম চালিয়েছেন, কখনো দিনমজুরের কাজ করেছেন।
কয়েক দিন আগে কাজের সন্ধানে বান্দরবানে যান নাছির। সেখানে একটি আমবাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজও শুরু করেছিলেন। কিন্তু কাজ শেষ করে আর বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর।
গত ২১ আগস্ট বান্দরবানের টংকাবতী ইউনিয়নের একটি আমবাগানে কাজ করার সময় নাছিরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাঁর বাবা সেকান্দর আলী বাদী হয়ে বান্দরবান সদর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় পটিয়ার মোহাম্মদ মানিক (২৪) নামে একজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন মোবাইল ফোন চাওয়াকে কেন্দ্র করে নাছিরের সঙ্গে মানিকের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে শ্রমিকদের চিৎকার শুনে অন্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে নাছিরকে গলাকাটা অবস্থায় রক্তাক্ত পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় মানিক তাঁর হাতে থাকা দা ফেলে পালিয়ে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি দা উদ্ধার করেছে বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
নাছিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট ঘরটির এক পাশে একটি খাট, পাশে কয়েকটি চেয়ার। ঘরের প্রতিটি কোণেই যেন দারিদ্র্যের ছাপ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাছিরের আয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভর করত পুরো সংসার।
প্রায় ৬০ বছর বয়সী বাবা সেকান্দর আলী অসুস্থ। শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যায় নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। ফলে অল্প বয়সেই সংসারের বড় দায়িত্ব এসে পড়ে নাছিরের কাঁধে।
কাজের সন্ধানে দূরে যাওয়ার পর ছেলের মৃত্যুর খবরও পরিবার জানতে পারে অন্যের মাধ্যমে। স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের কাছ থেকে খবর পেয়ে তাঁরা জানতে পারেন, নাছির আর বেঁচে নেই।
যে ছেলে কিছুদিন আগে পরিবারের অভাব ঘোচাতে কাজের সন্ধানে বাড়ি ছেড়েছিলেন, সেই ছেলের লাশ দেখতে হবে—এটা হয়তো কোনো বাবা-মায়ের কল্পনাতেও থাকে না।
নাছিরের মা জীবন আরার কান্না থামছিল না। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে খুন না করে একটা হাত, একটা পা কেটে নিত। অন্তত ছেলেটা মা ডাকত। বেঁচে থাকত।”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তাঁর প্রশ্ন, “একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমকে কীভাবে খুন করতে পারে?”
একজন মায়ের এই প্রশ্নের উত্তর যেন কারও কাছে নেই।
এদিকে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, “অসহায় পরিবারটিকে আবেদন জমা দিতে বলুন। উপজেলা প্রশাসন যথাসাধ্য পাশে দাঁড়াবে।”
অভাবের সংসারে যে ছেলেটি ছিল পরিবারের অন্যতম ভরসা, আজ সেই ঘরেই পড়ে আছে তাঁর স্মৃতি। মা শুধু ছেলেকে হারাননি—হারিয়েছেন সংসারের একটি বড় অবলম্বনও।
